সমাজ গঠনে দক্ষ সাংবাদিকতা অন্যতম নিয়ামক

0

 

সমাজ গঠনে দক্ষ সাংবাদিকতা অন্যতম নিয়ামক

 

মহান পেশা হিসেবে আখ্যায়িত ও সমাজের বিবেক নামে পরিচিত একটি পেশার নাম সাংবাদিকতা, মহান ভাষা অন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধসহ বর্তমান সময়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে সাংবাদিক মহলের অসামান্য অবদান দেখিয়ে যাচ্ছে। সময়ের সাথে সাথে সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল ও অনলাইন মিডিয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ  চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরে নিবন্ধনকৃত দৈনিক, অর্ধ-সাপ্তাহিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক, বার্ষিক এবং অন্যান্য পত্র-পত্রিকার মোট সংখ্যা ৩১৭৬ টি (অক্টোবর ২০২২ )। ধারণা করা হয় এর কয়েক গুন বেশি রয়েছে অনলাইন পত্রিকা, যেখানে বেশিরভাগের নেই নিবন্ধন। সেই সাথে এই পেশায় যুক্ত হচ্ছে হাজারো মানুষ, সহজে যুক্ত হওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এই মহান পেশায় নাম লেখাচ্ছে অদক্ষ, স্বল্প শিক্ষিত, অসৎ উদ্দ্যেশের অধিকারী এবং স্বার্থলোভি মানসিকতার কিছু মানুষ, যাদের ভেতরে নেই কোনো আদর্শ, প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ও দেশপ্রেম। যার কারণে সংবাদপত্র ধরে রাখতে পারছেনা তাদের সেই ঐতিহ্য। এখনি যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়া হলে এই পেশার ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়তে পারে।

 


নিরপেক্ষভাবে সত্য ঘটনাকে দূরদূরান্ত থেকে পর্যাপ্ত তথ্যসহ সংগ্রহ করে সংবাদমাধ্যম ও গণমাধ্যমের সাহায্যে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরাকে সাংবাদিকতা বলা হয়। একজন সাধারণ মানুষের কাছে সাংবাদিকের গ্রহনযোগ্যতা সত্য ও দক্ষতার উপর ভিত্তি করে জন্মায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমরা মানহীন সাংবাদিকতা বেশি দেখতে পাচ্ছি।  আর নিয়ন্ত্রনহীনভাবে যে কেউ এই পেশায় যুক্ত হতে থাকলে এই মহান পেশা জনসাধারণের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। যা আমাদের কারো কাম্য নয় । তখন দেখা যাবে সংবাদপত্র প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা ব্যক্তি কেন্দ্রিক হয়ে যাবে। যারা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি, দল  বা প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করবে। বেশীরভাগ সময় প্রতক্ষ্য হয় এমন সংবাদকর্মীরা প্রতিপক্ষের বা দূর্বল মানুষের সামান্য ঘটনাকে বড় আকারের শিরোনাম দিয়ে প্রকাশ করবে।আমলযোগ্য অপরাধ না হলেও তাতে বিকৃত ছবির ব্যবহার করে তা সাধারণ মানুষের কাছে সম্মানহানী হয় এমনভাবে উপস্থাপন করবে। যাচাইবাছাই ছাড়া তথ্য ব্যবহার করা, নিউজ পড়া ও ফলোয়ার বৃদ্ধির জন্য ভূয়া শিরোনাম ব্যবহার করে থাকে। তাদের কাজের ফলে সমাজ যে ক্ষতির শিকার হচ্ছে তা উপলব্ধি  করার সেই জ্ঞান তাদের নেই বললেই চলে। কারণ তাদের চিন্তা ভাবনা নির্দিষ্ট গণ্ডীর ভিতর সীমাবদ্ধ থাকবে।

 

হাতে গুণা কিছু মানুষের জন্য এমন একটি মহান পেশাকে কলঙ্কিত করা যাবে না, তাও এমন একটি পেশাকে যার উপর একটি দেশের গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও দেশপ্রেমের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠে। কিছু ভুঁইফোড় সাংবাদিকদের কারণে সমাজের পেশাদার ও মূলধারার সাংবাদিকগণ বিভিন্ন সময় বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে। বর্তমান সময়ে প্রায় বিভিন্ন পত্রিকার শিরোনামে দেখা যায়, অপরাধীর সাথে হাত মিলিয়ে নিজেও অপরাধমূলক কাজের সাথে জড়িত হয়ে যাওয়া, যাকে তাকে হুমকি দেয়া , চাঁদা দাবি, চাঁদা না দিলে নিউজ করার ভয় দেখানো, ভুলে ভরা সংবাদ প্রকাশ করা, পদে পদে অদক্ষতার পরিচয় বহন করা, সাংবাদিকতার রীতিনীতি সম্পর্কে অজ্ঞ আর এই সকল অপরাধকে আড়াল করার জন্য ব্যবহার করছে সাংবাদিকের মতো মহান পেশাকে। এ কাজ করতে গিয়ে তারা ভঙ্গ করছে দেশের প্রচলিত আইন কিন্তু তারা এই বিষয়ে মোটেও ওয়াকিফ নয়। তারা বিভিন্ন সময় মানহানিকর অপরাধ করছে। যেমন: আমরা প্রায়ই দেখি কোন ধরণের যাচাই বাছাই ছাড়া অন্যের নিকট হতে প্রাপ্ত ভুল তথ্য প্রচার করছে, যা দন্ডবিধির ৪৯৯ ধারাকে সারাসরি ভঙ্গ করে। এছাড়াও এটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ এর ২৯ ধারাকেও ভঙ্গ করে। শুধু তাই নয় এধরণের কাজের জন্য একজন মানুষ প্রতিকার পাওয়ার জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ এর ২৯ ধারায় মামলা করতে পারেন। এখন থেকে অপসাংবাদিকতার প্রমাণ পেলে সংবাদ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে জরিমানার বিধান রেখে ‘প্রেস কাউন্সিল (সংশোধন) আইন ২০২২’এর খসড়া মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে। এই আইন কার্যকর হলে অনেকাংশেই অপসাংবাদিকতার মাত্রা কমে যাবে, এই ধারণা আমরা করতেই পারি।

 

এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে সর্বপ্রথম পদক্ষেপ নিতে হবে আমাদের মূলধারার সচেতন সাংবাদিক মহলকে। তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা ছাড়া এই পেশার সুনাম অক্ষুন্ন রাখা সম্ভব না। তাই মূলধারার সাংবাদিকদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। উপজেলা ভিত্তিক অনলাইন তথ্য ভাণ্ডার করার একটি প্রক্রিয়া তথ্য মন্ত্রনায়লয় হতে করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সাংবাদিকতায় প্রবেশের পূর্বে অবশ্যই ১-২ বছরের কোনো প্রবীণ সাংবাদিকের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করতে হবে। যেকোনো পরীক্ষা বা সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে নিয়োগ দিতে হবে। অবশ্যই সাংবাদিকগনের জন্য সময় উপযোগী বেতন ও অন্যান্য ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে। সাংবাদিকতার আইডি কার্ড জেলা ভিত্তিক সংগঠন হতে ইস্যু করতে হবে। তাদের জন্য প্রতি ছয় মাস পর পর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, ভূয়া সাংবাদিকদের শাস্তি অন্যান্য পত্রিকায় প্রকাশ করতে হবে।এতে করে যেমন আমাদের প্রকৃত সাংবাদিক ভাইয়েরা তাদের প্রাপ্য সম্মান যথাযথ ভাবে পাবে, তেমনি নবীন সাংবাদিকগণ স্বাচ্ছন্দে এই পেশায় কাজ করবে। দেশের সংবাদ পত্রের উপর সাধারণ মানুষের আস্থা আরো দৃঢ় হবে।মানুষ সত্য ঘটনা জানতে পারবে, নিজের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হবে এবং সচেতন হবে, এর ফলে আগামীর প্রজন্ম একটি উৎকৃষ্ট সমাজ পাবে।

 

লেখক- মোঃ আরিফ ঊল্লাহ

সাংবাদিক ও শিক্ষানবিস আইনজীবী,

কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত।

ইমেইলঃarifcbiu@gmail.com

 

Tags

Post a Comment

0Comments
Post a Comment (0)