উন্নয়নশীল ও জলবায়ু পরিবর্তনের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা একটি দেশ বাংলাদেশ, পৃথিবীর
অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলো ইতিমধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির
বহু পথ পাড়ি দিয়ে ফেলেছে কিন্তু আমরা এখনো এই খাতে অনেক পিছিয়ে রয়েছি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি
যেমন পরিবেশের জন্য উপকারী তেমনি দেশের অর্থনীতিতেও রাখতে পারে বিরাট ভূমিকা, শুধু
তাই নয় এর মাধ্যমে একটি দেশ তাদের অনেক ক্ষেত্রে পরনির্ভরতা কমিয়ে আনতে সক্ষম।
গ্লোবাল কার্বন বাজেট (Global Carbon Budget) ২০২৫ অনুযায়ী ২০২৫ সালে কার্বন ডাই অক্সাইড
নির্গমনের হার বেড়ে ১.১ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, যার মূল কারণ হলো
তেল, গ্যাস ও কয়লা, এবং ধারণা হচ্ছে এটি সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছাবে, সেই সাথে মোট জীবাশ্ম
জ্বালানি থেকে ৩৮.১ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন হবে। বাংলাদেশও প্রায় ৯০
শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরশীল, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে প্রায় ৯ কোটি মেট্রিক
টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ হয়েছে, একই বছর আমদানি ব্যয় ছিল প্রায় ১৩ বিলিয়ন ইউএস
ডলার, ২০২৩-২০২৪ সালে এই খাতে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়,
২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে পেট্রোবাংলা এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা করেছে প্রায় ৫৫ হাজার
কোটি টাকা। অপর দিকে বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে
উৎপাদন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী নবায়নযোগ্য জ্বালানি
খাত থেকে এতো অল্প সময়ে এমন অর্জন করা অনেক কঠিন হয়ে পড়বে। আমরা যদি এখন থেকে যদি জীবাশ্ম
জ্বালানি থেকে সরে আসতে সরে না পারি তাহলে একদিকে যেমন পরিবেশ ধ্বংস হবে, অন্যদিকে
ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করা পরিকল্পনাতেই সীমাবদ্ধ
থেকে যাবে। বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রধান খাত হতে পারে জ্বালানি তেল, ফলে অন্য দেশ থেকে তেল আমদানির পরিমাণ
হ্রাস পাবে, সৌর, বায়ু ও পানির মাধ্যমে উৎপন্ন হবে বিদ্যুৎ, গোবর, হাঁস মুরগীর বিষ্ঠা
ও আবর্জনা থেকে তৈরি হবে গ্যাস ও জৈব সার। এক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতাও দেখা যায়,
যেমন নবায়নযোগ্য শক্তির যেকোনো প্রকল্প শুরু করতে বড় একটি সংখ্যার অর্থ বিনিয়োগ
করতে হয় এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই খাতে ঋণ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে না, এবং এই
খাতে বেসরকারি বিনিয়োগও আমরা তেমন দেখতে পাই না। যেহেতু এই শক্তির জন্য প্রয়োজনীয়
যন্ত্রাংশ এখনো আমদানি নির্ভরশীল তাই এই শক্তি সংরক্ষণের ব্যয়ও অনেক এবং ভালো
মানের পণ্য পাওয়া যায় না। সরকারের জ্বালানি নীতিতেও ঘাটতি রয়েছে যা আরো সমৃদ্ধ করা
বর্তমানে সময়ের দাবীতে পরিণত হয়েছে। এখনো এই প্রকল্পগুলো সম্পর্কে মানুষ
তুলনামূলকভাবে তেমন ধারণা পায়নি এবং সমাজে এর গ্রহণযোগ্যতা কম। প্রাকৃতিক
দুর্যোগের কারণে এই প্রকল্পের ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকিও বেশি।
বর্তমান সময়ে বিশ্বের অনেক দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে প্রশংসনীয়
অগ্রগতি হাসিল করেছে, আমরা যদি দেখি ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের মতো
দেশগুলো বিস্ময়কর রূপান্তর ঘটাতে সক্ষম
হয়েছে, যা অন্যান্য দেশের জন্য অনুকরণীয় অবস্থানে পৌঁছেছে। কোনো দেশ বায়োমাস, সৌর
ও বায়ু বিদ্যুতে সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে, কেউ বৈদ্যুতিক গাড়ী উদ্ভাবনে আলোড়ন তৈরি
করেছে আবার কিছু দেশ কার্বন নিঃসরণে বিরাট লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক
উৎস ও ভৌগলিক অবস্থানের কারণে আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য শক্তির
সম্ভাবনা অনেক, আমরা যদি দেখি বিষুবরেখার সন্নিকটে হওয়ায় বাংলাদেশে প্রতি
বর্গমিটারে গড়ে ৪ কিলোওয়াটের বেশি সোলার রেডিয়েশন পাওয়া যায়। আমরা নদী, হাওর ও
পুকুরে সৌর বিদ্যুৎ স্থাপন করতে পারি, এছাড়াও রুফটপ প্রকল্পে সরকার ভর্তুকি কিংবা
সহজ শর্তে বিনিয়োগ করলে এটিও ছাদ বাগানের মতো সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় ও
গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে। বায়ু শক্তির বেশ কয়েকটি সফল প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা
আমাদের রয়েছে, আমরা চাইলে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও কুয়াকাটার চলাঞ্চলে আরো বেশ কিছু
টারবাইন বসাতে পারি।ধারণা করা যাচ্ছে ২০৩১ সালের মধ্যে আমাদের প্রাকৃতিক গ্যাসের
মজুদ ফুরিয়ে যেতে পারে যদি না এই সময়ের মধ্যে আমরা নতুন কোনো প্রাকৃতিক গ্যাসের
সন্ধান না পাই, এর উত্তম পরিপূরক হতে পারে কৃষি বর্জ্য, গোবর, বিষ্ঠা ও বর্জ্য
থেকে বিদ্যুৎ বা গ্যাস উৎপাদনের বিষয়টি, যা অনেকের কাছেই পরিচিত কিন্তু এই সকল
প্রকল্পে সরকারকে আরো কাজ করতে হবে। এখানে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের
সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নজর দিতে হবে। আমরা চাইলে সমুদ্র শক্তিকেও ব্যবহার করতে পারি এবং
এই খাতের যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে বলে অনেক বিশ্লেষকরা বিশ্বাস করে। এসকল কাজ খুব সহজে
করা যেতে পারে, যদি আমরা কমিউনিটিকে অন্তর্ভুক্ত করে এই কাজগুলো করতে পারি, আমাদের
মনে রাখতে হবে, বড় একটি প্রকল্পের বিপরীতে ছোট ১০টি প্রকল্প অনেক ভালো, সরকারকে
কারিগরি দক্ষতা ও পণ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রতিটা কাজেই ঝুঁকি থাকবে এবং এসকল ঝুঁকি নিয়েই আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে,
এবং সরকারকে এই ঝুঁকি হ্রাসে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, দেশী-বিদেশি তহবিল সংগ্রহ করতে হবে, জলবায়ু
ফান্ড বৃদ্ধিতে এডভোকেসি চালিয়ে যেতে হবে, সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে, প্রতিটি
বাড়ীর চাল এবং ছাদ
যেন এক একটি সৌর শক্তির উৎসে পরিণত হয় তা নিশ্চিত করতে হবে, প্রতিটি খামার যেন বায়োগ্যাস
উৎপাদনে সক্ষম হতে পারে তার জন্য কাজ করতে হবে।
লেখক,
মো. আরিফ উল্লাহ
গবেষক ও উন্নয়ন কর্মী
ইমেইল: arifullah@coastbd.net

