বাড়ছে হাম সংক্রমণ, প্রতিরোধই এখন একমাত্র ভরসা

0

 

বাড়ছে হাম সংক্রমণ, প্রতিরোধই এখন একমাত্র ভরসা

হাম, মিজলস বা রুবিওলা, বর্তমান সময়ে এক আতঙ্কের নাম। এটি একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। এরই মধ্যে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ১০০ জন মারা গিয়েছে। হাম মূলত Measles virus এর মাধ্যমে ছড়ায়। এটি একটি single-stranded RNA ভাইরাস। শিশুদের মাঝে এই রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যায়, তবে তার মানে এই নয় যে এটি শুধু শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, এই ভাইরাস সব বয়সের মানুষকেই আক্রমণ করতে পারে।



দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকা অঞ্চলে এটি বিশ্বব্যাপী মৃত্যুহার ও অসুস্থতার অন্যতম কারণ। যারা সাম্প্রতিক সময়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশ তথা ইয়েমেন, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নাইজেরিয়া ও অ্যাঙ্গোলা ভ্রমণ করেছে, তারা উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।

 

যেহেতু এই রোগ অতি সংক্রামক, সেহেতু আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি বা কাশি দিলে, আক্রান্ত ব্যক্তির কাছাকাছি থাকা, তার সঙ্গে কথা বলা বা তার আশেপাশে সময় কাটালে সংক্রমণ ঘটতে পারে। এছাড়া ভাইরাসযুক্ত বস্তু, যেমন দরজার হাতল বা টেবিল স্পর্শ করে পরে চোখ, নাক বা মুখে হাত দিলে এই রোগ ছড়াতে পারে। এই ভাইরাস কিছু সময় বাতাসে ভেসে থাকতে সক্ষম, তাই একই ঘরে থাকলে অন্য ব্যক্তি সহজেই আক্রান্ত হতে পারে।

 

যেসব লক্ষণ বা উপসর্গ দেখে আমরা বুঝতে পারি যে একজন ব্যক্তি হাম (Measles) রোগে আক্রান্ত, সেগুলো হলোপ্রথমে হালকা জ্বর, যা পরবর্তীতে বেশি হয়ে থাকে। এর সঙ্গে সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া ও পানি পড়া দেখা যায়। এছাড়া মুখের ভেতরে সাদা দাগ এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। গুরুতর ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া, কানে সংক্রমণ, নিউমোনিয়া ও খিঁচুনি দেখা দিতে পারে। এই সকল লক্ষণ দেখা মাত্র চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। হামের ভাইরাস ২ থেকে ৪ সাপ্তাহের মধ্যে লক্ষন দেখা যায়। আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে যে সকল কারণ বেশি লক্ষণীয় তার মধ্যে রয়েছে হাম প্রতিরোধের টিকা না নেয়া, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে থাকা,  অপুষ্টিতে ভোগা, অসুস্থ ব্যক্তি দ্রুত আক্রান্ত হয়ে থাকে, ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা। সবচেয়ে বড় কারণ হলো হাম সম্পর্কে না জানা, আমাদের অধিকাংশ অভিভাবক হাম কি, কীভাবে ছড়ায় এবং কীভাবে শিশুকে নিরাপদ রাখা যায় সে সম্পর্কে ধারনা নেই।

 

বাংলাদেশে হামের বর্তমান আবস্থা আলোচনা করলে যে সকল বিষয় উঠে আসে তা হলো, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, পাবনা, চট্টগ্রাম, যশোর ও নাটোরে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে। মার্চ  মাসে ২১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। WHO তত্ত্বাবধানে ঢাকায় নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে, যেখানে সাতটি সদর হাসপাতাল ও চারটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

 

আমরা কিছু সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ অনুসরণ করলে হাম থেকে রক্ষা পেতে পারি। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক বয়সে মিসেলস, মাম্পস, রুবেলা (MMR) টিকা নেওয়া, যা শিশুর শরীরকে ভাইরাসের বিরুদ্ধে শক্তিশালী করে। এছাড়া সংক্রমণ থেকে নিজেকে ও শিশুকে রক্ষা করতে আক্রান্ত ব্যক্তির কাছাকাছি না যাওয়া, হাঁচি বা কাশির সময় মুখ ঢেকে নেওয়া বা টিস্যু ব্যবহার করা, এবং ঘনবসতিপূর্ণ জায়গা বা জনসমাগম এড়িয়ে চলা খুব জরুরি।

আমাদের দৈনন্দিন হাইজিনও আমাদের গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে, যেমন খাবারের আগে এবং নাক-মুখ স্পর্শের আগে হাত ধোয়া, নাক-মুখ পরিষ্কার রাখা, এবং অপরিষ্কার হাত দিয়ে চোখে স্পর্শ না করলে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়। এই সব পদক্ষেপ মেনে চললে আমরা হাম ভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকতে পারি এবং আমাদের পরিবার ও সমাজকে নিরাপদ রাখতে সাহায্য করতে পারি।

কেউ যদি মনে করে সে হাম আক্রান্ত রোগির সান্নিধ্যে এসেছে এবং তার হাম হতে পারে বলে সন্দেহ করে, তাহলে তার উচিত সংস্পর্শে আসার ৭২ ঘন্টার মধ্যে হামের টিকা নেওয়া অথবা সংস্পর্শে আসার ছয় দিনের মধ্যে ইমিউন গ্লোবুলিন নেওয়া। আমাদের মাথায় রাখতে হবে, হামের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা এখনো আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। যদি কোনো ব্যক্তি আক্রান্ত হয়ে যায়, তাহলে তার যে কাজ করার ক্ষেত্রে মোটেও অবহেলা করা যাবেনা তা হলোঃ কোনোভাবে কালক্ষেপন না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, শিশুদের টিকার আওতায় নিয়ে আসা, প্রচুর পরিমাণে তরল পান করা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম অপরিহার্য একটি উপাদান, স্টিম ইনহেলেশন ব্যবহার করা, যা গলা প্রশমিত করতে এবং কাশি কমাতে সাহায্য করে, উচ্চমাত্রার ভিটামিন এ সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া।

বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করে আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণে টিকার মজুদ করতে হবে। অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটার আগে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা যেন পাওয়া যায়, সে বিষয়ে এখন থেকেই আলোচনা করে যেতে হবে। ল্যাব সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রতিবেশী দেশ থেকে যেন বেআইনি অনুপ্রবেশ না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সচেতনতা বৃদ্ধি করা, কারণ আমরা যত সচেতন হব, ততই আমরা ঝুঁকিমুক্ত থাকতে পারব। সর্বোপরি, আমাদের সরকার, এনজিও, মিডিয়া, স্বাস্থ্যকর্মীসহ সকলকে একসাথে কাজ করতে হবে।

 

লেখকঃ

মোঃ আরিফ উল্লাহ
প্রতিষ্ঠাতা
কোস্টাল কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার
ইমেইলঃ
arifcbiu@gmail.com

Post a Comment

0Comments
Post a Comment (0)