২০১৭ সালে মানবিক দিক বিবেচনা
করে প্রায় ৭ লক্ষ (বর্তমান সংখ্যা প্রায় ১১ লক্ষ) রোহিঙ্গাকে কক্সবাজার জেলার উখিয়া
ও টেকনাফ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় দেয় বাংলাদেশ সরকার। স্থানীয় মানুষ নিজেদের
সাধ্যমতো তাদের কৃষি জমি, বসতভিটা এমন কি নিজের খাবার ও পোশাক দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ায়ে
ছিল। পরবর্তিতে রোহিঙ্গাদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা নির্ধারন করে দেয়া হয় এবং ২০২০ সালের
শুরুর দিকে সমগ্র ক্যাম্পকে কাঁটাতারের ব্যাষ্টনিতে
নিয়ে আসা হয়। ক্যাম্প এলাকার মধ্যে বসবাস করা অনেক পরিবার এই ব্যাষ্টনির ভেতর বসবাস
করতে বাধ্য হয়, যার সংখ্যা আনুমানিক প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজারের মতো। যাদের অবস্থা
প্রায় রোহিঙ্গাদের মতোই। তারা পূর্বপুরুষদের ভিটে মাটি ছাড়তে পারছে না, আবার নিজের
জমি ছেড়ে অন্য স্থানে গিয়ে বসতবাড়ি করার সামর্থও নেই। এই জমি বিক্রি করলেও পাবেনা ন্যায্য
মূল্য, এমন অবস্থায় বাধ্য হয়ে স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও কাঁটাতারের মধ্যে অসহায় জীবন
যাপন করছে এই পরিবারগুলো। হাজারো সমস্যার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে তাদের জীবনের প্রতিটি
মুহূর্ত।
সময়ের সাথে সাথে রোহিঙ্গারা
নানান অপরাধ কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েছে, আল ইয়াকিন, আরএসও সহ প্রায় ১০টি স্বসস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন রোহিঙ্গা শিবিরে সক্রিয় রয়েছে, যাদের প্রধান
দুটি কাজ হলো অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় এবং মাদক কারবার পরিচালনা। অপহরণ উখিয়া-টেকনাফে
এমন আকার ধারন করেছে যা নিয়ে সকল স্তরের মানুষ আতঙ্কিত। কোনোভাবেই এই অবস্থার উন্নতি
সাধন করা যাচ্ছে না বরং দিন দিন পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়ে উঠছে। স্কুল ছাত্র, কৃষক,
দিন মজুর, শিক্ষক থেকে শুরু করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি পর্যন্ত কেউ বাদ পড়েনি অপহরণের
শিকার হওয়া থেকে। যেখানে ক্যাম্প সংলগ্ন অনেক এলাকায় স্থানীয় মানুষ যাওয়ার সাহস পাচ্ছে
না, সেখানে এতগুলো পরিবার ক্যাম্পের ভিতরে রাত্রিযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। সন্ধ্যার পর
এলাকাবাসী নিজ গ্রামের মধ্যে চলাচল করতে ভয় পাচ্ছে, জরুরী কাজে বের হতে হলেও আশেপাশের
মানুষকে নিয়ে বের হতে হয়, অন্যথায় এক সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে আরেক সমস্যা সম্মুখীন
হতে হবে, আর এই সমস্যা পূর্বের সমস্যার চেয়ে বহুগুণ বেশী ভয়ঙ্কর। কিন্তু যে পরিবারগুলো
ক্যাম্প এরিয়ার ভিতরে অবস্থান করছে তাদের ক্ষেত্রে এই ভয় অনেক গুন বেশী। বিভিন্ন সময়
স্বসস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনীগুলো প্রাকাশ্যে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। তারা আধিপত্য বিস্তারের
জন্য ওপেন চ্যালেঞ্জ দিয়ে থাকে। এমনকি ক্যাম্পে অগ্নিসংযোগের ভয় দেখায়। আর এই প্রতিটি
সংঘাত ক্যাম্পের ভেতরে অবস্থানরত স্থানীয় পরিবারগুলোর রাতের ঘুম হারাম করে ফেলে। কারণ
রোহিঙ্গাদের শেল্টার পুড়ে গেলে জাতিসঙ্ঘের এজেন্সিগুলো তা ২৪ ঘন্টার মধ্যে মেরামতের
কাজ শুরু করবে কিন্তু সারা জীবনের পরিশ্রমের টাকা দিয়ে তৈরি স্বপ্নের বাড়ী একবার পুড়ে
গেলে তা আরেকবার তৈরি করা সম্ভব না।
অন্যদিকে ক্যাম্পের ভেতরে
প্রবেশ ও প্রস্থানের জন্য প্রতিবার আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র দেখাতে
হয়। এনআইডি হারিয়ে গেলে কিংবা ভুলে সাথে করে না আনলে তার জন্য পোহাতে হয় আরো মস্তবড়
ঝামেলা। অনেক সময় এসকল প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে গিয়ে হারাতে হয় পরীক্ষার মূল্যবান সময়,
চিকিৎসকের সিরিয়াল, অফিসে দেরিতে পৌছানসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর থেকেও বড় সমস্যা
হলো জরুরী প্রয়োজনেও ক্যাম্পের ভিতরে গাড়ী প্রবেশ করাতে হলে নিতে হয় ক্যাম্প ইন চার্জ
(সি আই সি) এর অনুমোদন, আর এই অনুমোদনের জন্য রোহিঙ্গা শিবিরে এ্যাম্বুলেন্স প্রবেশসহ
অন্যান্য যান চলাচল সম্ভব হয় না, যার ফলে রোগী ও প্রসূতি মায়ের কষ্ট বেড়ে যায় কয়েকগুণ
বেশি। তাছাড়াও অনেক ক্যাম্পে নিরাপত্তা ও মাদকের দিক বিবেচনা করে যানবাহন চলাচল বন্ধ
করে দেয়া হয়েছে, যার ফলে শিক্ষার্থীদের স্কুলে আসা যাওয়া এবং স্পেশাল টিউশন নেয়া খুবই
দুরূহ ব্যাপার। আগের মতো এই পরিবারগুলো স্বাচ্ছন্দে কৃষিকাজ কিংবা হাঁসমুরগি, গরু,
ছাগল লালন পালন করতে পারছে না। কারণ একটু চোখের আড়াল হলেই চুরি হয়ে যায় আদরের পোষ্য
প্রাণী। দুঃখজনক বিষয় হলো রোহিঙ্গাদের মতো সকল কষ্ট সহ্য করে চলেছে এই পরিবারগুলো কিন্তু
তাদের জন্য নেই কোনো বিশেষ সুবিধা, রোহিঙ্গারা সারা বছর সহায়তা পেলেও তারা পাচ্ছেনা
নামমাত্র কোনো সুবিধা, এটা আবশ্যই বলতে হয়, অনেক ক্যাম্প ইন চার্জ (সিআইসি) নিজেদের
উদ্যোগে তাদেরকে বিভিন্ন সুবিধার পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়।
এ অবস্থা থেকে স্থানীয় পরিবারগুলোকে
মুক্তি দিতে হলে সর্বপ্রথম তাদের জন্য বিকল্প নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
তাদের যে ক্ষতি সাধন হয়েছে বা হবে তা প্রশমনের জন্য ও তাদের জীবন মান উন্নয়নের জন্য
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। অপহরণ বন্ধে ঝুঁকিপূর্ন
এলাকা চিহ্নিত করে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করতে হবে। যতদিন পর্যন্ত স্থায়ী সমাধান
না হচ্ছে ততদিন স্থানীয়দের ছবিসহ তালিকা করে এপিবিএন এর চেকপোস্টে টাঙ্গীয়ে রাখা যাতে
করে প্রতিবার এনআইডি চেক করতে না হয়। স্থানীয় পরিবারের জন্য যান চলাচল স্বাভাবিক করে
দেয়া, এক্ষেত্রে যানবাহন তল্লাশি করার বিঁধান রাখা যেতে পারে। জরুরী কাজে ও রোগী পরিবহণে
ক্যাম্পের ভিতরে যানবাহন চলাচলের বিঁধান শিথিল করা। সকল বিষয় বিবেচনা করে ক্যাম্প সংশ্লিষ্ট
অফিসগুলো এবং জেলা প্রশাসন স্থানীয় ৩ হাজার পরিবারের কষ্ট লাঘবে দ্রুত পদক্ষেপ নিবেন
বলে আশা রাখি, সেইসাথে এই পরিবারগুলো স্বাধীন দেশে পরাধীনতার জিঞ্জীরা থেকে মুক্তি
পাবে বলে মনে করি।
মো. আরিফ উল্লাহ
গবেষক ও উন্নয়নকর্মী,
কক্সবাজার।
Email: arifcbiu@gmail.com
০১৭০৫৭৯০১৫০

