তামাক
এমন একটি বস্তু যা শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সকল ক্ষেত্রেই ক্ষতির চিহ্ন রাখে,
এমন এক পণ্য যা সম্মানিত ব্যক্তি ও স্নেহের ব্যক্তির সামনে গ্রহণ করা যায় না। এই
তামাকের কারণে মানুষ ক্যান্সার, হৃদরোগ ও স্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের রোগ, হজম
ও মুখের ক্ষতি, গর্ভাবস্থায় ক্ষতি, আসক্তি ও মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হয়। এই নেশায় ধ্বংস হয়ে গেছে অনেক
পরিবার, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে হাঁটছে আমাদের যুব সমাজ। এতো ক্ষতির পরেও বাংলাদেশের
প্রায় ২৫টি জেলায় এই তামাকের চাষ বেড়েই চলেছে, মানা হচ্ছে না কোনো শর্ত। ক্ষতির
মুখে পড়ছে আশেপাশের কৃষিজমি ও পরিবেশ।
আমাদের দেশের গরিব কৃষকদের দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে
কিছু কোম্পানি বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে তামাক চাষে উদ্বুদ্ধ করে চলেছে। বীজ থেকে শুরু
করে সার, প্রায় সকল কিছুই এই কোম্পানিগুলো প্রদান করে থাকে। আমাদের কৃষক ভাইয়েরাও তামাক
চাষের ভয়াবহতা সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন না, অন্যদিকে
অধিক মুনাফা পাওয়া যায়, যার কারণে দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে এই তামাক চাষ, যেখানে রংপুর,
লালমনিরহাট এবং মানিকগঞ্জ জেলা অন্যতম। কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের তথ্যমতে ২০২৩-২০২৪
এর তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তামাক চাষ বেড়েছে ৪৪ শতাংশ, যা আমাদের পরিবেশ ও স্বাস্থ্য
উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। ২০১৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার
একটি গবেষণায় দেখা যায় বিশ্বে তামাক সেবনের কারণে মারা যায় প্রায় ৮৭ লাখ মানুষ।
সিগারেট,
জর্দা, বিড়ি, গুল, তামাক ডাঁটা, তামাক পাতা ও তামাক সংশ্লিষ্ট সকল পণ্যই তামাক
পণ্য, আমরা সকলেই জানি তামাক ও তামাক পণ্য খুবই ক্ষতিকর তারপরেও বিশ্বজুড়ে প্রতি
বছর ৫ ট্রিলিয়ন এর বেশি সিগারেট প্রতি বছর বিক্রি করা হয় এবং বাংলাদেশে এই সংখ্যা
প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া ধূমপান ও অন্যান্য তামাক পন্যের ব্যবহারকারীর মোট
জনসংখ্যার ৩১ শতাংশ। তামাকের ধোঁয়ায় ৭০টির বেশি ক্যান্সার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক
পদার্থ থাকে যা ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করে ও ক্যানসার কোষ দ্রুত বাড়তে সহায়তা করে এর
ফলে ফুসফুস, মুখ, গলা, অন্ননালী, পাকস্থলী, অগ্ন্যাশয়, যকৃত, বৃহদান্ত্র, মলাশয়,
কিডনি, মূত্রথলি, স্তন ও জরায়ুমুখ ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। আমরা অনেকেই মনে করি
ধুয়া ছাড়া তামাক পণ্য এতো টা ক্ষতিকর নয়, কিন্তু এটা আমাদের অনেকের ভুল ধারণা,
আমরা যদি দেখি জর্দা, সাদাপাতা, খৈনি, গুল ইত্যাদি খেলে মুখ ও গলার ক্যান্সার,
দাঁত ও মাড়ির মারাত্মক ক্ষতি, হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ, হজম ও কিডনির সমস্যা,
গর্ভবতী মা ও শিশুর ক্ষতি হয়।
আমরা এখন দেখছি এই তামাক চাষের বিস্তার কৃষি জমি থেকে এখন নদীর
২ পাশে ছড়িয়ে পড়েছে, যার ফলে নদীর জীববৈচিত্র্য মারাত্মক রকমের ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে,
রাসায়নিক সার, আগাছানাশক কীটনাশক প্রয়োগের ফলে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে, এতে করে
মাছের ডিম, পোনা, জলজ উদ্ভিদ ও জলজ প্রাণী মারা যায় ও প্রজনন ব্যাহত হয়। ছাড়াও
নদীভাঙন দেখা দিতে পারে, তীর ক্ষয়ের হয়, নদীর পানি মানুষের ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে
পড়ে এমনকি এই পানি ব্যবহারের ফলে বিভিন্ন ধরনের চর্ম ও পানি বাহিত রোগ হতে পারে,
নদী ও এর আশপাশের পরিবেশকে দীর্ঘমেয়াদে মৃতপ্রায়
করে তুলতে পারে।
কৃষি
জমিতে তামাক চাষ করলে যে ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় তা হলো তামাক গাছ
অতিমাত্রায় পুষ্টি শোষণ করে যার দরুন মাটি পুষ্টিহীন হয়ে যায়, তাই কৃষি মহলে
তামাককে “পুষ্টি-খেকো ফসল”
বলা হয়, অন্যদিকে মাটি ক্ষয়প্রবণ হয়ে যায় এবং জমির উর্বরতা হ্রাস পায়। সুতরাং এটা
বলা যায় যে তামাক চাষের পরে অন্য ফসল চাষ করলে গাছের বৃদ্ধি ঠিকমতো হয় না এবং ফলন
ভালো হয় না, আলু, বেগুন ও টমেটুর মতো সবজি
চাষ করলে মাটি-বাহিত রোগ (ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া) বেশি হয়। তামাক চাষের পর একই মাটিতে
অন্য ফসল চাষ করতে গেলে মাটিতে যে পরিমাণ খরচ ও শ্রম দিতে হয় তা দিয়ে লাভবান হওয়া
একজন কৃষকের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
আমাদের
দেশে তামাক চাষ নিয়ন্ত্রনে Control of Land Utilisation and Farm Land Protection
Ordinance, 2026 এ শুধুমাত্র বছরে ৩বার বা তার চেয়ে বেশি ফসলি জমিতে তামাক চাষ
নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কিন্তু এতে পাহাড়ি এলাকা, নদী তীর, বন বা বিশেষ পরিবেশগত
সংবেদনশীল অঞ্চলে তামাক চাষ নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে স্পষ্ট কোনো বিধান নেই, যার ফলে
এসকল এলাকায় চলছে অনবরত তামাক চাষ, অন্যদিকে ধাপে ধাপে এক ও দুই ফসলি জমিতে তামাক
চাষ বন্ধ করার কথা থাকলেও এর কোনো বাস্তবিক প্রয়োগ দেখা যায় না। Smoking and
Tobacco Products Usage (Control) Act, 20১৫ এ তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার, বিক্রয়,
বিজ্ঞাপন ও প্রচার নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে বলা হয়েছে কিন্তু তামাক চাষ বা তামাক উৎপাদন
বিষয়ে তেমন কিছুই নেই। Environment Conservation Act, 1995 এখানে পরিবেষ রক্ষায় ও
পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে কিন্তু এখানেও
তামাকের ব্যাপারে পরিস্কার কোনো পদক্ষেপের কথা উল্লেখ নেই। National Tobacco
Control Policy, 2019 তে তামাক চাষকে নিরুৎসাহিত করা ও বিকল্প ফসল উৎপাদনে উৎসাহ
দেয়া হলেও এটি একটি নীতি যার ফলে এর আইনগত বাধ্যবাধকতা দুর্বল।
সুতরাং আমাদের উচিৎ Tobacco Control Policy, 2019 কে আর সুসংগঠিত করে আইনে
রুপ দেয়া এবং অন্যান্য আইনে তামাক চাষ ও তামাক পন্য উৎপাদন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রনে স্পস্ট
সংশোধনী আনা, তামাকের বিকল্প ফসলে কৃষকদের উৎসাহী করে তুলা এবং জনসচেতনতার বৃদ্ধি করা।
মোঃআরিফ উল্লাহ
গবেষক ও উন্নয়নকর্মী
কোস্ট ফাউন্ডেশন

