স্ত্রী তালাক চাইলে স্বামী কেনো দেনমোহর পরিশোধ করবে?

0

ইসলাম সবসময় বিবাহ বিচ্ছেদ এবং ভিক্ষাবৃত্তিকে নিরুৎসাহিত করে। তারপরেও প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশে এই দুটি নিকৃষ্ট কাজ ঘটে চলেছে। শুধু মাত্র ঢাকা শহরে প্রতি ঘ ন্টায় একটি করে তালাকের ঘটনা ঘটে। কেউ নিজের লোভ সামলাতে না পেরে আর কেউ নিজের ইগোর কারণে অথবা স্বামী/স্ত্রীর এমন আচরণ যার ফলে বিবাহ বিচ্ছেদ জরুরী হয়ে পড়েছে, এই ভেবে একটি দম্পতি বিচ্ছেদের দিকে অগ্রসর হয়। বিবিএস তথা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বলছে, গত সাত বছরে তালাকের প্রবণতা ৩৪ শতাংশ বেড়েছে, অবাক হওয়ার জন্য আরেকটু ধৈর্য ধরুন, এই বিচ্ছেদের আবেদনের ৭০ শতাংশ আসে স্ত্রীর পক্ষ থেকে। শুধুমাত্র ঢাকা দক্ষিন সিটি কর্পোরেশনে ২০২১ এর নভেম্বর মাস পর্যন্ত স্ত্রী কর্তৃক বিচ্ছেদের সংখ্যা ৪ হাজার ৭শত ৭৯ টি যেখানে এই সিটি কর্পোরেশনে মোট ডিভোর্সের সংখ্যা ৬৬৬৬টি। সুতরাং আমাদের সামাজিক অবস্থান মোটেও ভালো না। অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের এই অবস্থা থেকে কি শিক্ষা নিবে তাও আমাদের এখনি ভাবা উচিৎ।

 





প্রসঙ্গ হচ্ছে তালাক যদি স্ত্রী দেয় তাহলে স্বামী কেনো কাবিন/দেনমোহর পরিশোধ করবে? যেহেতু আমরা মুসলিম তাই চলুন ইসলাম কি বলে দেখি; প্রথমত ইসলাম ধর্মে “তালাক” কে শয়তানের কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, আকামুল কুরআন, ৩৯ খ এর পৃষ্ঠা নং : ১৩৩ এ একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে তা হলো “আলী (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা বিয়ে করো, কিন্তু তালাক দিয়ো না। কেননা তালাক দিলে তার দরুন আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে”। অন্যদিকে সূরা নিসা এর ১৯ নং আয়াতে পুরুষদের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে ‘তাদের সঙ্গে সৎভাবে জীবনযাপন করবে।’ উল্লেখিত হাদিস শরিফ ও কোরআনুল কারিমের আয়াত দুটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে তালাক দেয়া থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে এবং পুরুষদেরকে সৎভাবে জীবন যাপনের নির্দেশ করা হয়েছে। এক কথায় বিবাহ বিচ্ছেদ যদিও হালাল কিন্তু এটা থেকে বিরত থাকা ও একে অন্যকে ছাড় দিয়ে, মিলে মিশে থাকাই উত্তম কাজ। একসাথে বসবাস করলে তর্ক, ঝগড়া, মনোমালিন্য হবেই, আর এই বিষয়েও ইসলাম খুব সুন্দর একটি সমাধান দিয়েছেন, আল্লাহ  সুবহানাহু ওয়া তাআলা কুরআন মাজিদ এর সূরা আন নিসার ৩৫ নং আয়াতে বলেন, “উভয়ের মধ্যে বিরোধ আশঙ্কা করলে তার (স্বামীর) পরিবার থেকে একজন ও তার (স্ত্রী) পরিবার থেকে একজন সালিস নিযুক্ত করবে। তারা উভয়ে নিষ্পত্তি চাইলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মিমাংসার অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবগত।’ তাই তালাক বা ডিভোর্স থেকে বিরত থাকা সর্বাবস্থায় শ্রেয়।

ইসলাম স্বামীকে তালাকের ক্ষমতা দিয়েছেন অন্যদিকে স্ত্রীর কেবল মাত্র কিছু ক্ষেত্রে তালাকের আবেদন করতে পারে। এখন ভাবছেন স্ত্রীর যদি ক্ষমতা না থাকে তাহলে এতো এতো তালাকের আবেদন স্ত্রী কিভাবে করে? তালাক দেয়ার পদ্ধতি ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭ নং ধারায় বলা হয়েছে। আবার স্ত্রী কোন কোন ক্ষেত্রে তালাকের আবেদন করতে পারে এই সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইনে। এছাড়া তালাক ও রেজিষ্ট্রির সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯৭৪ এর ৬ ধারায়।



আমরা বিবাহের সময় অতিথি, স্টেজ এবং ছবি তোলা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, কাবীননামাতে স্বাক্ষর করার জন্য বাহারি রঙের কলম কিনতে ভুল করিনা, কিন্তু কাজী সাহেব কাবিননামাতে কি লিখলো তা পড়ার সময় নেই। মূলত কাবিন নামার ১৮ নং ধারার কারণে স্ত্রী স্বামীকে তালাক দেয়ার ক্ষমতা পেয়ে থাকে। এই ১৮ নং ধারায় স্বামী ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষমতা তার স্ত্রীকে দিয়ে থাকেন, বিয়ের দিন বর কাবিননামাতে স্বাক্ষর করা মোনাজাত কখন শেষ হবে তা নিয়ে ব্যস্ত থাকে আর কাজী সাহেব তার ১৮ নং ধারায় টিক মার্ক দিয়ে দেয়। যেহেতু ডিভোর্স দেয়ার ক্ষমতা স্বামীর তাই কাবিন দেয়ার দায়িত্বও স্বামীর উপরই বর্তায়। আরেকটি বিষয় স্ত্রী তালাক দেয় না, স্ত্রী তালাক নেয়। এখানে বিষয়টি হলো স্ত্রী স্বামীর ক্ষমতা প্রয়োগ করতেছে, তাই কাজী কিংবা উকিল সাহেব এমনভাবে লেখে থাকেন যেন স্ত্রী তার স্বামীকে তালাক দিচ্ছে না বরং স্বামী থেকে প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে সে নিজেকে স্বামীর থেকে তথা বিবাহ বন্ধন থেকে তালাক নিচ্ছে। এ বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে যদি মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বার ৯/৫৮২ নং হাদিস শরিফটি দেখি; তাবেঈ হজরত মানসুর (রহ.) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে বলেছে, ‘তোমার তালাক গ্রহণের ক্ষমতা তোমার হাতে।’ এ কথা শুনে স্ত্রী বললো, ‘আপনি তিন তালাক।’ এ সম্পর্কে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা তাকে বৃষ্টি না দিন (অর্থাৎ তার উদ্দেশ্য সফল না হোক)।’ যদি সে (ঐভাবে না বলে) বলতো, ‘আমি তিন তালাক’, তাহলে যা বলেছে তা-ই হতো।’ সুতরাং যদি কোনো স্ত্রী তার স্বামীকে তালাক দিয়েছে এই মর্মে তালাক নিয়ে থাকে তাহলে উক্ত হাদিস মতে এই তালাক নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে, কারন মুসলিম আইনের উৎপত্তি হলো কোরআন ও হাদিস।

 

সর্বোপরি আমাদের উচিৎ পাত্র পক্ষের এবং পাত্রের আর্থিক অবস্থান বিবেচনা করে দেনমহর নির্ধারন করা, যেন খুব কম বা বেশি না হয়, বিয়ের আগে কাবিননামা পাত্র ও কণে পক্ষের উপস্থিতিতে প্রস্তুত করা। দেনমহর এমন একটি বিষয় যার ক্ষেত্রে ইসলাম কিঞ্চিৎ পরিমান ছাড় দেয়নি, এ ক্ষেত্রে স্ত্রীর মতামতের উপর সকল কিছু বর্তায়। কিন্তু বিবাহ বিচ্ছেদের এমন একটি কাজ যার পরিবার কাঠামোকে ভাঙ্গন সৃষ্টি করে, সমাজে স্বামী/স্ত্রীর দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, সততার ঘাটতি ও নেতিবাচক মানসিকতার তকমা লাগিয়ে দেয়, যদিও আমরা দেখি ডিভোর্স দেয়ার সময় আশেপাশের অনেকেই উৎসাহিত করে কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তাদের মতেরও পরিবর্তন দেখা যায়।

 

লেখক: মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ

শিক্ষানবিশ আইনজীবী ও উন্নয়ন কর্মী,

Email: @arifcbiu@gmail.com


Tags

Post a Comment

0Comments
Post a Comment (0)