উপকূলীয় এলাকার রক্ষাকবজ
নামে পরিচিত একটি বনের নাম হলো প্যারাবন বা ম্যানগ্রোভ বন। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম নোয়াখালী,
পিরোজপুর, পটুয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, বরগুনা ও ভোলার উপকূলীয় এলাকা এই বনের মনোরম প্রকৃতি
দেখা যায়। এটি বিশেষ এক প্রকার উদ্ভিদ, যা লবণাক্ত পানিতে জন্মায়। প্রতিটি প্রাকৃতিক
দুর্যোগের হাত থেকে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষকে রক্ষা করেছে এই বন। বিশেষ করে সুন্দরবনের
কথা আলাদা করে বলতেই হয়। ঘূর্ণিঝড় বুলবুল, নার্গিস, রিমেলসহ সব ক্ষেত্রে নিজেকে উজাড়
করে দিয়েছে এই বন। এর বাইরেও ম্যানগ্রোভ বনায়নের অনেক সুফল রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম
হলো এই বনায়ন যে স্থানে করা হয়, সেখানে কালি লতা, বিকাটা, হারবা গাছ, কাঞ্চলতাসহ বিভিন্ন
প্রজাতির গাছ জন্মায়। নদীর তীরে এই বনায়ন হওয়ায় এটি যেমন মাছের চারণভূমির জন্য উৎকৃষ্ট,
তেমনি ডিম ছাড়ার জন্যও আদর্শ স্থান। সেইসঙ্গে এই বনায়ন মাছের খাদ্য জোগান দেওয়া, পাখি
নতুন আবাস্থল তৈরি করে, হারিয়ে যাওয়া বন্যপ্রাণী ফিরে আসতে সহায়তা করাসহ আমাদের প্রতীবেশকে
সুরক্ষায় বিরাট ভূমিকা রাখে।
সবকিছু আমরা জানি কিন্তু
মানি না, বুঝি কিন্তু করি না, তার থেকেও বড় বিষয় হলো ‘আমার একজনের জন্য তো আর দেশ ভেসে
যাবে না?’ এমন উদ্ভট যুক্তি দিয়ে, প্যারাবন উজাড় করে চলেছি বন অধিদপ্তরের তথ্য মতে
উপকূলীয় বনায়নের পরিমাণ বন অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রিত মোট বনভূমির প্রায় ১২.৫০ শতাংশ, হেক্টর
হিসেবে প্রায় ১,৯৬,০০০ হেক্টর। এ ছাড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর ও বাংলাদেশের ফুসফুস
নামে পরিচিত সুন্দরবনে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল রয়েছে প্রায় ৩,৯৬৮ বর্গমাইল বা ১০,২৭৭ বর্গকিলোমিটার,
যেখানে বাংলাদেশের খুলনা বিভাগে বনাঞ্চল প্রায় ২,৩২৩ বর্গমাইল বা ৬,০১৭ বর্গকিলোমিটার,
যা দেশের আয়তনের ৪.১৩ শতাংশ। কিন্তু বাস্তবে এর পরিমাণ কতখানি, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে,
গণমাধ্যমগুলো প্রতিনিয়ত আমাদের এই সংবাদগুলো পৌঁছে দিচ্ছে, প্রায়ই দেখা যায়, বন উজাড়
করে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড, কারখানা তৈরি, বিভিন্ন ফার্ম, বিনোদনকেন্দ্র, পর্যটনকেন্দ্র
স্থাপনের নামে ধ্বংস করা হচ্ছে উপকূলীয় বনায়ন ও প্যারাবন। সেই সঙ্গে সুন্দরবন দখলে
নেমেছে কিছু অসাদু চক্র। আইনকে বৃদ্ধাঙুল দেখিয়ে সুন্দরবন এলাকার ১০ কিলোমিটারের মধ্যে
তৈরি করছে কটেজ, রিসোর্ট ও পর্যটকদের আকর্ষণ বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন স্থাপনা, যা পরিবেশ
সংরক্ষণ আইনে গুরুত্বর অপরাধ এবং অবৈধ। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২-এর
৬, ৪১, ৩৬ ও ৩৭ ধারায় বন্যপ্রাণী শিকার, হত্যা, ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং
এর শাস্তির কথা বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিনিয়ত এই ঘটনাগুলো ঘটেই চলেছে এবং অধিকাংশ
ক্ষেত্রে অপরাধীরা রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ভূমিদস্যু ও অতিলোভী মানুষের
হাত থেকে উপকূলীয় বনায়ন এবং সুন্দরবনকে রক্ষায় এখনই পদক্ষেপ না নিলে আগামীর প্রতিটি
প্রাকৃতিক দুর্যোগ সরাসরি আঘাত হানবে আমাদের জানমালের ওপর আর এভাবে চলতে থাকলে আগামীর
বিশ্ব সাক্ষী হবে আরেকটি ১৯৯১ সালের ভয়াল সেই ঘূর্ণিঝড়ের। প্যারাবন বা উপকূলীয় বনায়ন
আমাদের যেভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে, তা আমাদের বিশাল অট্টালিকা কখনোই
করতে পারবে না। এ অবস্থা থেকে থেকে মুক্তি পেতে আমাদের পরিবেশ অধিদপ্তরকে আরো শক্তিশালী
করতে হবে, মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে দ্রুত বন দখলকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে,
আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা। সুন্দরবনে সাধারণ মানুষ ও নৌযানের চলাচলে বিধিনিষেধ
প্রয়োগ করা, প্রচলিত অপরাধগুলো চিহ্নিত করে কোস্টগার্ড, নৌপুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের
সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনা ও নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে, যেন উচ্ছেদের পর আবার দখল
হয়ে না যায়। এ ছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে আরো অধিক পরিমাণে দুর্যোগ সহনশীল বৃক্ষ রূপণ করতে
হবে। সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে, বিভিন্ন নামে সর্বস্তরের মানুষের
সমন্বয়ে এলাকাভিত্তিক কমিটি গঠন করতে হবে, যাতে করে সবার আগে তারা আওয়াজ তুলতে পারে
এবং উপকূলীয় বনায়ন ধ্বংসে বাধা দিতে পারে। প্যারাবন রক্ষায় শুধু উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ
নয়, সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
মোঃ আরিফ উল্লাহ
গবেষক ও উন্নয়নকর্মী
ইমেইলঃ #arifcbiu@gmail.com
Paper link: https://www.protidinersangbad.com/todays-newspaper/uposompadokio/465915

