সংঘবদ্ধ চক্রের কবলে বাজার ব্যবস্থা/ ২৭-১০-২০২৪

0

 

সংঘবদ্ধ চক্রের কবলে বাজার ব্যবস্থা

বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্যের অস্থিরতা এবং সিন্ডিকেটের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে। পরিবারের কর্তারা বাজারে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন, আয়ের চেয়ে ব্যয় ঘোড়ার গতি এতোটাই বেশি যে কোনোভাবেই লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হচ্ছে না। শেষ ভরসা আলু আর ডিম, তাতেও লোভী ব্যবসায়ীদের কুনজর পড়েছে। আমরা যদি লক্ষ্য করি, ২০২২-২০২৩ সালের মধ্যে আটা, চাল, তেলসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য ৬৬% থেকে ১৫১% বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে আমাদের অসাধু ব্যবসায়ীদের অবদানকে অস্বীকার করা যাবে না। এই সমস্যার সমাধানের জন্য সরকারকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে কিছু বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।



প্রথমত, বাজারে পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারকে আমদানি প্রক্রিয়ায় তদারকি বৃদ্ধি করতে হবে এবং আমদানিতে সরকারের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারলে আরও ভালো হবে। এতে কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকবে না এবং মূল্য স্থিতিশীল হবে। সরকারি পর্যায়ে আমদানি করলে সরকার পণ্যের মূল্য নির্ধারণে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারবে এবং সিন্ডিকেটের প্রভাব হ্রাস পাবে।

দ্বিতীয়ত, সিন্ডিকেটের একচেটিয়া দখল ভাঙতে সরকারকে নতুন ব্যবসায়ী সমাজ তৈরি করতে হবে। নতুন ব্যবসায়ীদের সহযোগিতার মাধ্যমে বাজারে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবে, যা পণ্যের মূল্য গ্রাহকের নাগালের মধ্যে আনতে সহায়ক হবে।

তৃতীয়ত, আমদানি পণ্য খালাসের আগে বন্দরে কঠোর তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে অবৈধ আমদানি এবং চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। বাজার মনিটরিং করতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। পাশাপাশি, পণ্যের মান নিশ্চিত করা এবং বিশুদ্ধ খাদ্য সরবরাহ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

চতুর্থত, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত সরকারকে অধিক চাহিদাসম্পন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ভর্তুকির মাধ্যমে চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, তেল, মাছ ও সবজি জাতীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এতে খেটে খাওয়া ও সাধারণ মানুষ এই পণ্যগুলো সহজে ক্রয় করতে পারবেন এবং তাদের জীবনযাপন সহজ হবে। অন্যথায় শ্রমজীবী ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য আলাদা কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। এটি হতে পারে সাপ্তাহিক বা মাসিক ভিত্তিতে স্বল্প মূল্যে পণ্য সরবরাহ করা।

পঞ্চমত, আমরা সংস্কার নিয়ে কথা বলি, সংস্কার করতে ভালোবাসি, তাহলে এই সিন্ডিকেট ভাঙতে সংস্কার কেন নয়? কৃষক থেকে সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা। এতে কৃষকের হাতেই তার প্রাপ্য মুনাফা যাবে, আর ভোক্তা স্বল্প দামে পণ্য গ্রহণ করতে পারবে। প্রশ্ন হলো, এটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে? বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন উৎপাদনের সাথে যুক্ত কৃষক ও খামারির সাথে ভোক্তাদের যোগাযোগ স্থাপন করা। কোনো নির্দিষ্ট স্থানে কৃষক ও খামারি তাদের পণ্য নিয়ে উপস্থিত হবেন এবং ভোক্তা তার চাহিদা অনুযায়ী ক্রয় করবেন। অথবা ভোক্তা স্বয়ং খামার বা মাঠ থেকে পণ্য সংগ্রহ করবেন। এখন প্রশ্ন হলো, ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে সমন্বয় করবে কে? এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, সামাজিক ও যুব সংগঠন এবং স্থানীয় জনসাধারণ। এর প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন আমাদের ধর্মীয় নেতা ও স্কুল শিক্ষকগণ।

উৎপাদনকারী ও ভোক্তাদের সরাসরি ব্যবসার মধ্যে নিয়ে আসলেই কি চলমান সমস্যার সমাধান হবে? এর উত্তর হলো “না”, তবে কিছু ইতিবাচক প্রভাব দেখা দেবে। প্রথমত, মানুষ নতুন একটি ব্যবস্থাপনার সাথে পরিচিত হবে। সিন্ডিকেট নামক ব্যাধি তার উদ্দেশ্য হাসিলে বড় এক বাধার সম্মুখীন হবে। এই ব্যবস্থা যতটা প্রসারিত হবে, ততোটাই জনপ্রিয় হবে। ছোট-মাঝারি উদ্যোক্তারা গড়ে উঠবেন। কিন্তু মধ্যস্থতাভোগী, চাঁদাবাজি ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সদিচ্ছা খুবই জরুরি; অন্যথায় সফলতা অর্জন করা সম্ভব নয়।

বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে সমাজের কিছু প্রচলিত নিয়ম থেকে বের হয়ে আসতে হবে, যেমন পণ্যের দাম বৃদ্ধির কথা জানামাত্র অধিক পণ্য ক্রয় করে মজুদ না করে ক্রয়ের সক্ষমতা হ্রাস করা। উক্ত পণ্যের বিকল্প থাকলে তা গ্রহণ করা, ছাদ বাগান বা বাড়ির উঠানে বাগান করা।

বাজারে পণ্যের দাম বাড়ানোর জন্য কৃত্রিম সংকট তৈরি করা অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা, নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন কার্যকর করে বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব হবে। স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, উন্নত গুদাম ব্যবস্থা এবং পরিবহন ব্যবস্থার দক্ষতাও নিশ্চিত করা দরকার। সরকারের পাশাপাশি জনগণের সচেতনতা এবং অংশগ্রহণও অপরিহার্য। জনগণকে বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন করতে হবে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার জন্য উৎসাহিত করতে হবে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সরকারের দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান আনতে পারে।

মোঃ আরিফ উল্লাহ
গবেষক ও উন্নয়নকর্মী
#arifcbiu@gmail.com

#২৭-১০-২০২৪ #মোঃ আরিফ উল্লাহ

 

Post a Comment

0Comments
Post a Comment (0)