দখল ও দূষণে মৃত্যুর পথে ঐতিহ্যবাহী সামরাই খাল

0

 

দখল ও দূষণে মৃত্যুর পথে ঐতিহ্যবাহী সামরাই খাল

 

একটা সময় যে খাল হাজারো মানুষের জীবিকা নির্বাহের ওসিলা ছিলো, সেই খাল এখন রোগী তৈরির কাজ করছে। যেই খালের পানি হাজার একর কৃষি জমির সেঁচের ব্যবস্থা করতো, দূষণের কবলে পড়ে আজ এই খালের পানি যেদিকে যায় সেদিকের ফসলী জমি নষ্ট হয়। বলছি কক্সবাজার পৌরসভার ৪, ৫ ও ৬ এসএম পাড়া, চৌধুরীপাড়া, মল্লিক পাড়া ও সিকদার পাড়া নিয়ে বিস্তৃত কক্সবাজারের ঐতিহ্যবাহী সামরাই খাল,যার দৈর্ঘ প্রায় ৩ কিলোমিটার এবং স্থানভেদে প্রস্থ ৮০ থেকে ১১০ ফুট। খুবই দুঃখের সাথে বলতে হয়, এই খালের প্রস্থ বর্তমানে ১৮ থেকে ৩০ ফুটে পরিণত হয়েছে। এলাকাবাসীর ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য মতে ২০০৬ সালের এই খালে নিয়মিত জোয়ার ভাঁটা দেখা যেতো, এছাড়াও ভিবিন্ন সময় মাটি খনন করতে গিয়ে মাছ ধরার ট্রলারের বিভিন্ন অংশ এলাকাবাসী উদ্ধার করেছে, যা প্রমাণ করে এই খালে শুধু জোয়ার ভাঁটা প্রবাহিত হতো এমন নয় বরং এখানে মাঝ ধরার ট্রলারের অবাদ চলাচল ছিলো। এই খালের সাথে মিশে আছে কক্সবাজারের অনেক সভ্যতা ও সংস্কৃতির নিদর্শন, যা এই খালের মৃত্যুর সাথে মিশে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।  

 

 

বর্তমানে এই খাল পয়োনিষ্কাশন, ময়লা আবর্জনা ফেলার স্থানে পরিণত হয়েছে। সমগ্র খাল এখন আবর্জনায় ভরে গেছে, পরিণত হয়েছে প্রভাবশালী মানুষের টাকার মেশিনে, যার ইচ্ছে সেই দখল করছে এবং মনগড়া দলীল তৈরি করে খাল বিক্রি করছে। কিন্তু এই খালের ছিলো সোনালী ঐতিহ্য, খালের ২ পাশে প্রায় ১ হাজার একরের বেশী জমিতে কৃষি কাজ হতো, এর উপর ভিত্তি করে অনেক পুকুর, জলাশয়ে মাছের চাষ হতো, ধারনা করা হয় প্রায় ৩০ হাজারের বেশী মানুষ এই খাল মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতো। আর এস খতিয়ান দাগ ১৪২৭, ৩৬০৩, ৩৬০৫, ৩৬৫৩, ৩৫৭৪,২১৩৬, ১৯৭০, ২৪০৬ মূলে এই সামরাই খালের পরিমাণ ছিলো প্রায় ১৬ একর। বিএস খতিয়ান দাগ  ৩৮৪, ৯৩৩৪, ৯৩০৪, ৬২৯৪, ৬৪৫২, ৬৫৩৬, ৬৫৭৩, ৬৭০৫ মূলে খালের পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ৭.৬৮ একর। যেখানে আরএস সিট নাম্বার ৩ ও ৪ এবং বিএস সিট নাম্বার ৬ ও ৭।

 


সামরাই খাল দখলের ফলে ১০০০ একর কৃষি জমি অনাবাদি হয়ে পড়েছে, পুকুর, জ্বলাশয়, ও ৩০ হাজার পরিবার নানান সমস্যায় জর্জরিত।  কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রায় ১০০ একর আবাদি জমি বেহাল দশায় পড়ে আছে। বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে প্রায় ২ হাজার পরিবার, বিঘ্ন হয় চলাচল, নষ্ট হয় আসবাবপত্র, ফসলী জমি। এছাড়াও রয়েছে তীব্র সুপেয় ও ব্যবহারের পানির সংকট, ময়লা আবর্জনার গন্ধে হর হামেশাই শিশু ও বয়স্ক মানুষ অসুস্থতায় ভুগছে, সেইসাথে বছর জোড়ে অতিরিক্ত মশার প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা যায়।

এমতাবস্থায়, কক্সবাজারের এই প্রাচীন সামরাই খাল রক্ষায় কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে, যা বাস্তবায়ন করা গেলে এই খাল ফিরে পাবে তার হারানো যৌবন।

 

সামরাই খাল এর সীমানা নির্ধারণঃ খালটিকে যদি আমরা তার পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে চাই তাহলে আরএস খতিয়ান মূলে সামরাই খালের সীমানা নির্ধারণ করাই অতীব যুক্তিযুক্ত, আর এস খতিয়ানে এই জমির পরিমাণ উল্লেখ আছে প্রায় ১৬ একর।

খাল দ্রুত পুনঃখননঃ সীমানা নির্ধারণের পর সামরাই খাল পুনঃখননের ক্ষেত্রে কিছু বিষয়ের দিকে নজর রাখতে হবে, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো বর্ষা মৌসুমে এই খালে বৃষ্টির পানির সাথে অধিক পরিমাণে পাহাড়ি মাটি ও রেল লাইনের বালি আসে, তাছাড়া প্ল্যাস্টিক ও পলিথিনের কারণে দ্রুত এই খাল যেন দূষিত না হয় সেদিকটিও বিবেচনায় নিতে হবে।

 

অবৈধ দখল উচ্ছেদঃ কক্সবাজারের কিছু অসাধু লোভী মানুষ ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে খালের দুই পাশের জমি দখল করে অট্রালিকা তৈরি করেছে, বর্তমান সরকার পরিবেশের ভার্সাম্য ফিরিয়ে আনতে ও জলবায়ুজনিত ক্ষতি হ্রাস করতে বদ্ধ পরিকর, সুতরাং, সামরাই খাল দখলের সাথে জড়িত সকল আপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নিশ্চিত করতে হবে, যেন আগামীতে কোনো মানুষ এমন ঘৃণিত কাজ করার সময় হাজার বার চিন্তা করে।

 

দূষণমুক্তকরণঃ খালে পানির অস্তিত্ব নেই বললেই চলে, আছে শুধু পলিথিন, প্লাস্টিক এবং বাসা বাড়ীর আবর্জনা। খাল খননের পর বাসা বাড়ীর সেফটি ট্যাংকের পানি, নালার দূষিত পানি যেন এই খালে না পড়ে সে বিষয়টি মাথায় রেখে কাজ করতে হবে। এই খাল যদি দূষণমুক্ত যায় তাহলে হাজার হাজার কৃষকের অনাবাদি জমি আবাদি জমিতে পরিণত হবে, সাধারণ মানুষের ব্যবহারের পানির সঙ্কট মিটে যাবে এবং জলাবদ্ধতার যে সমস্যা তা থেকে প্রায় ৩ হাজার পরিবার মুক্তি পাবে। সেই সাথে কমে যাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং কক্সবাজার ফিরে পাবে তার ঐতিহাসিক সামরাই খাল।

 

লেখকঃ

মো আরিফ উল্লাহ

লেখক ও গবেষক।

সদস্য-ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) , Email:arifcbiu@gmail.com

Tags

Post a Comment

0Comments
Post a Comment (0)