কিছু পদক্ষেপ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আমুল পরিবর্তন আনতে পারে

0


করোনা মহামারী,নতুন নতুন যুদ্ধ ও সময়ের ব্যবধানে রোহিঙ্গা ইস্যু দিন দিন আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে গুরুত্ব হারাচ্ছে। এর যথার্থ উদাহরণ হলো জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার বরাদ্ধ প্রতিবছর হ্রাস পাওয়া।আমরা যদি বিগত ৬ বছরের জয়েন্ট রেসপন্স প্লান (জেআরপি) এর হিসাব দেখি তাহলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে। ২০১৯, ২০২০ ও ২০২১ সাল প্রয়োজনের তুলনায় তহবিলের ঘাটতি ছিল যথাক্রমে ২৪%, ৪০.১ % ও ২৮.১%, ২০২২ সালে অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও ৫০.৮ শতাংশ কমে যায়। 


এমনভাবে তহবিল হ্রাস পাওয়া এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে উদ্বিগ্ন করে তুলে। একদিকে বরাদ্দ হ্রাস পাচ্ছে অন্যদিকে রোহিঙ্গা শিবিরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতিসংঘের শরনার্থী বিষয়ক সংস্থার যৌথ নিবন্ধন কার্যক্রমের তথ্য মতে যার বর্তমান সংখ্যা প্রায় ৯ লক্ষ ৪৫ হাজার ৯৫৩জন। এতে একটি বিষয় স্পষ্ট যে চাহিদা তার স্বাভাবিক গতিতে বেড়েই চলেছে আর এর বিপরীতে অর্থ তথা যোগান কমছে। এর ফলে রোহিঙ্গারা ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে বিভিন্ন বেআইনি কাজের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারী-বেসরকারি দপ্তরগুলো কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। যার মাধ্যমে রোহিঙ্গারা কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত থাকবে ও তারা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের পরিপূরক হয়ে কাজ করতে পাড়বে এর ফলে খরচ হ্রাস পাবে, দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে ও দলীয়ভাবে কাজ করার অনুপ্রেরণা পাবে।  


ব্লকভিত্তিক ওপেন সার্ভিস সেন্টারঃ ২০১৮ সাল হতে এখন অব্দি রোহিঙ্গা কিশোর-কিশোরীদের বিভিন্ন আয় বর্ধনমূলক কাজের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে কিন্তু এ প্রশিক্ষণ প্রাপ্তদের অধিকাংশই বেকার অলস সময় কাটাচ্ছে। প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে কিন্তু অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগানোর যায় এমন প্ল্যাটফর্ম এখনো অনুপস্থিত। এনজিও সংস্থাগুলোর উচিৎ ৪-৫ টি ব্লক নিয়ে এমন একটি সার্ভিস সেন্টার তৈরি করা যেখানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা নাম মাত্র পারিশ্রমিকের বিনিময়ে সোলার মেরামত, দর্জি, জাল বোনা, সেলুনের সেবা প্রদান করবে। সেই সাথে প্রয়োজনীয় শাক সবজী উৎপাদন, সাবান তৈরি ইত্যাদি কাজে রোহিঙ্গাদের অন্তর্ভূক্ত করা। এর ফলে তারা স্বল্প মূল্যে নিজেরা নিজেদের পণ্য ভোগ করতে পারবে। পাশাপাশি তাদের আয় বৃদ্ধি পাবে এবং ক্যাম্প থেকে বের হওয়ার প্রবণতাও কমে যাবে। 

সম্মিলিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাঃ রোহিঙ্গা শিবিরে ঘনঘন প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের ঘটনা ঘটে, তার মধ্যে পাহাড়ধ্বস, অতি বৃষ্টি, অগ্নিকান্ড ইত্যাদির ঘটনা বেশী পরিলক্ষিত হয়। চলতি মাসে সপ্তাহের ব্যবধানে ২ বার অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। এনজিও সংস্থার মাধ্যমে প্রতিটি ক্যাম্পের বিশাল একটি জনসংখ্যা রেসকিউ প্রশিক্ষণ পেয়েছে এবং প্রতিটি ক্যাম্পে তাদের স্বেচ্ছাসেবকদের একটি তালিকা রয়েছে। এই প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকদের স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের সাথে লিংক করে দেয়া, যেন ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স তাদেরকে রেসকিউ কাজে সরাসরি ব্যবহার ও দিক নির্দেশনা দিতে পারে। এর ফলে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে আসার পূর্বে এই প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকরা সুশৃঙ্খলভাবে নিজেরাই রেসকিউ করতে পারবে। 

ক্যাম্প সেফটি এন্ড সিকিউরিটি টিমঃ প্রতিদিন কোনো না কোনো ক্যাম্পে এক বা একাধিক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। ক্যাম্প এলাকায় প্রভাব বিস্তারের জন্য বিভিন্ন স্বশস্ত্র গ্রুপের উৎপাত লক্ষ্য করা যায়, এই গ্রুপগুলো মাঝে মধ্যে ক্যাম্পে আগুণ দেয়া, ঘর বাড়ি ভেঙে ফেলার হুমকি দিয়ে থাকে। যদিও পুলিশের একটি বিশেষায়িত দল (এপিবিএন) ক্যাম্পের আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করছে। কিন্তু এতো বড় জনগোষ্ঠীর জন্য তা নিতান্তই অপ্রতুল। কিছু ক্যাম্পে এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় সমন্বিত টহল দলের কথা শুনা যায় কিন্তু এই দলটি পর্যাপ্ত শক্তিশালী না। এই দলটিকে সকল ব্লকে বাধ্যতামূলক করা এবং প্রত্যেক দল থেকে ১জন সদস্য নিয়ে ক্যাম্প সেফটি এন্ড সিকিউরিটি টিম প্রনয়ন করা, যারা প্রতিমাসে এপিবিএন কে একটি প্রতিবেদন দিবে এবং এপিবিএন তাদের কাজে সহযোগিতা করবে। ক্যাম্প ইন চার্জ ব্লকভিত্তিক ওপেন সার্ভিস সেন্টার, সম্মিলিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ক্যাম্প সেফটি এন্ড সিকিউরিটি টিমকে ফলোআপ করবেন। 

সর্বশেষ বিষয় টি হলো দেশিও এনজিও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিবিরের কার্যক্রম পরিচালনা করা। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় বিদেশী সংস্থা একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যে পরিমান অর্থ ব্যয় করে তার অর্ধেকের কম পরিমান ফান্ড দিয়ে দেশীয় প্রতিষ্ঠান ঠিক তেমন একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সুতরাং ফান্ড ক্রাইসিসের এই মুহূর্তে এ বিষয়টি খুব গুরুত্বের সাথে লক্ষ্য করতে হবে। অন্যথায় উখিয়া –টেকনাফসহ সমগ্র কক্সবাজারের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হবে এবং চাহিদা মেটাতে না পেরে রোহিঙ্গারা  হিংস্র হয়ে উঠবে। স্থানীয়রা এমনিতেই  তাদের অনেকেই কৃষিজমি, নিজের বসতবাড়ি, কর্মসংস্থান হারিয়েছে, অধিক দামে কিনতে হয় প্রয়োজনীয় পন্য সামগ্রী, সেইসাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে অপহরণ ও মাদকের প্রভাব। এখনি যদি রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের বিশাল যুব সমাজকে কোনো কাজে লাগানো না যায় তাহলে আগামীর সময় কল্পনার চেয়ে অধিক ভয়ঙ্কর হতে পারে।


মোঃ আরিফ উল্লাহ
উন্নয়ন কর্মী ও লেখক
কোস্ট ফাউন্ডেশন। 
arifcbiu@gmail.com

Post a Comment

0Comments
Post a Comment (0)