শীত আসলেই মনে পড়ে যায় হরেক
রকমের পিঠাপুলি, খেজুরের রস, রাব আর মিঠাইয়ের কথা, শহুরে মানুষের জন্য শীতের আমেজ টা
একটু ভিন্ন, পছন্দের শীতের পোশাক কেনাকাটা, দেশে বিদেশে ঘুরে বেড়ানোসহ কতো কি। কিন্তু
আমরা কখনো আমাদের আশেপাশের হতদরিদ্র মানুষগুলোর
খবর নেই না, তাদের কথা চিন্তা করিনা, জানতে চাইনা এই শৈত্য প্রবাহে তাদের দিন কিভাবে
কাটছে। আমরা নিজেদেরকে নিয়ে ব্যস্ত থাকি, ভাবতে চাইনা রাস্তার পাশে জীবন যাপন করা মানুষগুলোর
কথা, খুঁজ নেই না শীতে কাতরাতে থাকা বৃদ্ধ প্রতিবেশীর, কখনো ভেবে দেখিনা ঘরের বুয়া,
দিন মজুর কিংবা দারোয়ানের পরিবারের অবস্থা।
আমাদের ভাবনা আমাদের নিজেদের
মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। আমি আমার জন্য শীতের কাপড় নিতে ভুল করি না, শীতের প্রসাধনী নিতেও
কার্পণ্য করিনা। ভেবে নেই আমরা যেমন আছি অন্যরাও আমাদের মতো ভালোই থাকবে। কারো সমস্যা
থাকলে তা সমাধানের জন্য সরকার আছে, এই ভেবে নিজের নৈতিক দায়িত্ব থেকে পাশকাটিয়ে চলে
যেতে পারলেই যেন বাঁচি। সামাজের প্রতি আমাদেরও যে দায়িত্ব আছে তা নিয়ে ভাবতে চাইনা।
পথের পাশে রাত কাটানো মানুষগুলোর কষ্ট অনুভব করি না, করতেও চাইনা, আমরা মস্তবড় অট্টালিকা
হিটার দিয়েও বলি অনেক শীত। আর এই শীতে খুলা আকাশের নিচে রাত্রি যাপন করা মানুষগুলোর
এক একটা রাত কতখানি দীর্ঘ হয় সে বিষয়টি আমাদের কল্পনার বাহিরে। বিশেষ করে ছোট বাচ্চা
ও বয়স্ক মানুষের কষ্ট অতি মারাত্বক এমনকি এই শীতে অনেকে মারাও যায়। ইউনিসেফের সহায়তায়
পরিচালিত “সার্ভে অন স্ট্রিট চিলড্রেন ২০২২” এর তথ্য মতে বাংলাদেশে পথ শিশুর সংখ্যা প্রায় ১০ লক্ষ।
অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন
থেকে জানা যায় বর্তমানে বাংলাদেশে বস্তিবাসীর সংখ্যা প্রায় ১৮ লাখ ৪৮৬ জন। এই বিশাল
সংখ্যক মানুষের মধ্যে প্রায় সকলেই শীতের কারণে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। সরকারের
একার পক্ষে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। আমাদের উচিৎ প্রত্যকের নিজ নিজ অবস্থান
থেকে এই মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানো সেটি হোক একজন না একটি পরিবার। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি
বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) এবং কানাডার ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের এক
গবেষণায় দেখা যায় শীতজনিত রোগবালাইয়ের কারণে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১০৪ জন মারা যায়।
যে সকল এলাকায় শীত ও দারিদ্রতা যত বেশী সেসকল এলাকায় মৃত্যুর হার ততোটা বেশী। এই গবেষণায়
আরো দেখা যায় ২০০৯ থেকে ২০২১ সালের শীত মৌসুমে মোট এক হাজার ২ শত ৪৯ জন মানুষের মৃত্যু
হয়।
এই অবস্থা থেকে উত্তরণের
জন্য আমাদের সকলকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে, আশেপাশের হতদরিদ্র, অসহায়
ও পিছিয়েপড়া মানুষের কথা ভাবতে হবে এবং তাদের কষ্টকে উপলব্ধি করতে হবে, নতুন হোক বা
পুরনো, দামী হোক বা সস্তা, কাপড় হোক বা ঔষধ, নিজে দেই বা অন্যদের থেকে নিয়ে দেই যেকোনো
উপায়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। আর এই ক্ষেত্রে জোড়ালো ভূমিকা রাখতে পারে স্থানীয় যুব
ও সামাজিক সংগঠনগুলো। সুতরাং সরকারের পাশাপাশি, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও যুব সমাজের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে
পারলে শীত মৌসুম হয়ে উঠবে সকলের জন্য আনন্দময়।

.png)