রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের মানবিকতার সীমা কোথায়?

0

 

রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের মানবিকতার সীমা কোথায়?



বাংলাদেশ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে বিশ্ব মানবতার এক নজির তৈরি করেছে যা বিশ্বের অন্য কোনো দেষ এমন সাহসিকতার পরিচয় দিতে পারেনি। ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউয়ের তথ্য মতে বাংলাদেশ বিশ্বের জনবহুল দেশের তালিকায় ৮ম দেশ অন্যদিকে জিডিপির অবস্থানে আময়াদের দেশ ১৫৩তম। ২০২২ সালের জনশুমারি তথ্য অনুসারে, দেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ১,২৬৫ জন মানুষ বসবাস করছে। সীমিত ভূমি, বিপুল জনসংখ্যা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং উন্নয়ন চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশ দীর্ঘ সময়ে ধরে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এটি নিঃসন্দেহে মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তবে দীর্ঘদিন ধরে এ সংকট চলতে থাকায় এর প্রভাব এখন বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, পরিবেশ ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

 

বর্তমানে বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। এর মধ্যে ১১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি কক্সবাজারে এবং প্রায় ৩৪ হাজার ভাসানচরে অবস্থান করছে। অন্যদিকে কক্সবাজার জেলার জনসংখ্যা প্রায় ২৮ লাখ ২৩ হাজার। ফলে রোহিঙ্গাদের অন্তর্ভুক্ত করলে জেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় ৪০ লাখে পৌঁছেছে। এর ফলে কক্সবাজারে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ১,১৩৩ জন থেকে বেড়ে ১,৬০১ জনে দাঁড়িয়েছে। একটি সীমিত আয়তনের জেলার জন্য এত বড় জনসংখ্যার চাপ ভবিষ্যতের জন্য নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়।

 

সমস্যা এখানে শেষ নয় রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ সারা বছর জোডেই চলছে, ২০২৫ সালেও মিয়ানমারের চলমান সংঘাতের কারণে প্রায় ৫০ হাজার নতুন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং আরও বহু মানুষের নিবন্ধন প্রক্রিয়া চলমান ছিল। একই সময়ে UNFPA-এর তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে প্রতি বছর প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার শিশুর জন্ম নিচ্ছে। অর্থাৎ নতুন করে অনুপ্রবেশের পাশাপাশি স্বাভাবিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণেও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আকার ক্রমাগত বড় হচ্ছে। যার দরুন বাংলাদেশের ওপর চাপও বছর বছর আরও বাড়ছে।

 

বাংলাদেশ ১৯৭৮, ১৯৯২ এবং ২০১৭ সালে মানবিক দায়িত্বের পরিচয় দিয়ে মিয়ানমারে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্ব সীমাহীন হতে পারে না।২০১৭ সালের এই বিশাল ঢলের আট বছরেরও বেশি সময় ধরে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি কক্সবাজারের বনভূমি, জীববৈচিত্র্য, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণও অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত নানা বিরূপ প্রভাবের মুখোমুখি হচ্ছে। এরই মধ্যে কক্সবাজারে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে, লবণাক্ততা বাড়ছে, সড়কে প্রতিনিয়ত যানজট লেগেই থাকে। আবাসন সংকট, পাহাড় কাটা, বন নিধন এবং কৃষিজমি কমে যাওয়ার প্রবণতাও দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে।

 

এই অবস্থায় নতুন করে অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ ঠেকাতে বাংলাদেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও কঠোর ও কার্যকর করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এর অর্থ এই নয় যে, নির্যাতিত মানুষের প্রতি বাংলাদেশ উদাসীন বরং মানবিক দায়িত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা এবং দেশের সক্ষমতার মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে সীমান্তে নজরদারি জোরদার, মানবপাচার প্রতিরোধ, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় এবং মিয়ানমারের ওপর কার্যকর কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। সেই সাথে এই বোঝা অন্যান্য দেশের মধ্যে ভাগাভাগি করার প্রস্তাব দৃঢ ভাবে তুলে ধরতে হবে। আমরা দেখেছি আমাদের পাশের দেশ ভারত তাদের কোনক্রমেই কোন রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে রাজি হয়নি। কারণ এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাংলাদেশের একার সমস্যা নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও দায়িত্ব এবং তাদের দ্বায়বদ্ধতা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে চিন, রাশিয়ার মতো দেশের আন্তরিকতা জরুরী, সেইসাথে মানবিক সহায়তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য জাতি সংঘ ও অন্তর্জাতিক সংস্থা ও রাষ্ট্রের সাথে কার্যকর নেটওয়ার্কিং বজায় রাখিতে হবে।

বাংলাদেশের মতো ছোট দেশের জন্য সীমিত সম্পদ দিয়ে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা এবং জনগনকে সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করা সরকারের পক্ষে খুবই জটিল একটি কাজ সেখানে ১২ লাখের একটি জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা দেশের অগ্রগতির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। তাই নতুন করে অনিয়ন্ত্রিত রোহিঙ্গা প্রবেশ রোধে সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার করা এখন কক্সবাজারের মানুষের অন্যতম দাবী। একই সঙ্গে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। মানবিকতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি একটি রাষ্ট্রের নিজস্ব নিরাপত্তা ও জনগণের স্বার্থ রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে বের করা আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

মো আরিফ উল্লাহ

গবেষক ও কলাম লেখক

arifcbiu@gmail.com

Post a Comment

0Comments
Post a Comment (0)