সমুদ্র সৈকত রক্ষায় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ হোক
বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক দূষণ এখন অন্যতম গুরুতর পরিবেশগত সংকট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণা ও পরিবেশগত পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, প্রতি বছর বিশ্বে ৪০০ মিলিয়ন টনেরও বেশি প্লাস্টিক উৎপাদিত হয়, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বর্জ্য হিসেবে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ১১ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য নদী ও সমুদ্রে প্রবেশ করে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৪০ সালের মধ্যে এ পরিমাণ প্রায় তিন গুণে পৌঁছাতে পারে। পরিবেশে জমে থাকা এসব প্লাস্টিক সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষুদ্র কণায় বা মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক মাছ, ঝিনুক, কচ্ছপ, সামুদ্রিক পাখি ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর দেহে প্রবেশ করে এবং খাদ্যচক্রের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীরেও পৌঁছে যায়। সাম্প্রতিক গবেষণায় মানুষের রক্ত, ফুসফুস, প্লাসেন্টা এবং এমনকি মস্তিষ্কের টিস্যুতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন মাত্রার উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
এই বৈশ্বিক বাস্তবতার বাইরে নয় বাংলাদেশও। বিশেষ করে কক্সবাজার, যা বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত এবং দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও জীববৈচিত্র্যের কেন্দ্র। প্রতিবছর লাখো পর্যটকের আগমন স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করলেও একই সঙ্গে বাড়ছে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার। প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ব্যাগ, খাবারের মোড়ক, কাপ, স্ট্র, চামচসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য প্রতিদিন সৈকত ও আশপাশের পরিবেশে জমা হচ্ছে। পর্যাপ্ত ও কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে এসব প্লাস্টিকের বড় একটি অংশ শেষ পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশছে।
কক্সবাজারের সামুদ্রিক পরিবেশ শুধু পর্যটনের জন্য নয়; এটি দেশের মৎস্যসম্পদ, প্রবাল, সামুদ্রিক কচ্ছপ, ডলফিন এবং উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্লাস্টিক দূষণের কারণে সামুদ্রিক প্রাণী খাদ্য ভেবে প্লাস্টিক গিলে ফেলে অথবা প্লাস্টিক বর্জ্যে আটকে প্রাণ হারায়। ফলে জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে মৎস্যসম্পদ, উপকূলীয় অর্থনীতি এবং খাদ্যনিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ছে।
বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে পলিথিন নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। পাশাপাশি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (বিশেষ করে SDG
11, SDG 12, SDG 13 এবং SDG 14) বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। তবে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি কার্যকর বাস্তবায়ন, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং জনগণের আচরণগত পরিবর্তন নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) ও অন্যান্য বনাম বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য, রিট পিটিশন নং–১৪৯৪১/২০১৯ মামলায় ৬ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে হাইকোর্ট পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করেন।
হাইকোর্টের নির্দেশনায় সরকারকে বিদ্যমান পলিথিন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা, উপকূলীয় এলাকায় প্লাস্টিক ব্যাগের ব্যবহার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাঁয় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহারের উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই রায়ের মূল উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশ সংরক্ষণ, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কক্সবাজারের মতো উপকূলীয় পর্যটন এলাকায় এ নির্দেশনার কার্যকর বাস্তবায়ন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন আমরা কোথাও দেখতে পাই না। যদিও বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ পর্যটন এলাকা ও পরিবেশ রক্ষায় ওয়ান টাইম প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করে কঠোর জরিমানার ব্যবস্থা করেছে। ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, কেনিয়া ও সেশেলসসহ অনেক দেশে প্লাস্টিক ব্যবহারে শত থেকে কয়েক হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত জরিমানা করা হয়। কেনিয়া ও রুয়ান্ডার মতো দেশে জরিমানার পাশাপাশি কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে। পরিবেশ দূষণ কমাতে এসব দেশ রিফিল স্টেশন, পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য ও পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং চালু করেছে। বাংলাদেশের পর্যটন এলাকাগুলোতেও প্রকৃতি রক্ষায় এমন কার্যকর আইন ও এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কক্সবাজারে একটি সমন্বিত "Plastic
Controlled Tourism Zone" প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। পর্যটনকেন্দ্রের প্রবেশপথে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণ, নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে এসব সামগ্রীর বিক্রয় ধাপে ধাপে সীমিত করা, কাপড়, পাট, কাগজ ও বাঁশের তৈরি বিকল্প পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা দেওয়া সময়োপযোগী পদক্ষেপ হতে পারে। এছাড়াও উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে এই বিষয়ে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েও প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
একই প্রবেশ পথ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন, বর্জ্য পৃথকীকরণ ব্যবস্থা, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য সংগ্রহকেন্দ্র এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং ব্যবহারে উৎসাহিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনে নীতিগত বাধ্যবাধকতা আরোপ করা যেতে পারে।
এছাড়া জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার, বন বিভাগ, পর্যটন কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী মনিটরিং ও সমন্বয় কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। নিয়মিত পরিবেশগত তথ্য সংগ্রহ, সৈকতের বর্জ্য নিরীক্ষা (Beach
Litter Audit), মাইক্রোপ্লাস্টিক পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে একটি কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন সম্ভব।
পরিবেশ রক্ষার এই উদ্যোগকে কেবল পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি জনস্বাস্থ্য, জলবায়ু সহনশীলতা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, টেকসই পর্যটন এবং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একটি পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন এলাকা আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছেও অধিক আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, যা স্থানীয় কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
কক্সবাজার শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির প্রতীক। তাই এখনই সময় গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা, কার্যকর আইন প্রয়োগ, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, নাগরিক সচেতনতা এবং সকল অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে "প্লাস্টিকমুক্ত কক্সবাজার" গড়ে তোলার। আজকের সঠিক সিদ্ধান্তই আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও টেকসই উপকূল নিশ্চিত করতে পারে।
মোঃ আরিফ উল্লাহ
লেখক, গবেষক
ও কলামিস্ট
প্রতিষ্ঠাতা
কোস্টাল
কমিউনিটি
ডেভেলপমেন্ট
রিসার্চ
সেন্টার (সিসিডিআরসি)
arifcbiu@gmail.com

